আগাছার মতো গজিয়ে উঠেছে ফ্রীল্যান্সিং ট্রেনিং সেন্টার

বাংলাদেশে নতুন এক মুলা ঝোলানো শুরু হয়েছে, ফ্রীল্যান্সিং। গত কয়েকবছর ধরে আগাছার মতো গজিয়ে উঠেছে ফ্রীল্যান্সিং ট্রেনিং সেন্টার। সরকারের বিভিন্ন ইনিশিয়েটিভ এর সুযোগ নিয়ে সাধারন অবুঝ মানুষের কাছ থেকে গছিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। আর না জেনে এদের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে সাধারন মানুষ।

এই ট্রেনিং সেন্টারগুলোর শতকরা ৯৯% ভাগের ট্রেইনারদের নিজেদের কাজ করার তেমন কোন এক্সপেরিয়েন্স নেই। মার্কেট সম্পর্কে ধারনা নেই। এরা নামমাত্র কিছু কাজ হয়তো কখনো করেছে, ট্রেনিং সেন্টার খুলে এরপর মানুষের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, অসম্পূর্ন শিক্ষা দিয়ে।

আসি গ্রাফিক্স ডিজাইন নিয়ে। এরা ভেক্টর জিনিসটা কি ঠিকভাবে ব্যাখ্যা না করে দুইদিন ইলাষ্ট্রেটর শিখিয়েই খালাস। একটা ক্যানভাস এর সাথে রিয়েল লাইফে ডাইমেনশন এর রিলেশন কি শেখানোর চেষ্টা করে না এরা, নিজেরাও জানে না। ষ্টুডেন্টদের দিয়ে আবার কাজ ও করিয়ে নেয় নামমাত্র টাকায়। এরা ষ্টুডেন্ট দের ফ্লায়ার বানানো শেখায়, লিফলেট বানানো শেখায়, ম্যাগাজিন বানানো শেখায়। এইসব কাজের রিয়েল মার্কেটে মুল্য খুব কম। প্যাকেজিং ডিজাইন, ইন্টারফেস ডিজাইন, প্রডাক্ট ডিজাইন নিয়ে কোন আইডিয়া দেওয়া হয় না ষ্টুডেন্টদের। এইসব ট্রেনিং সেন্টার এর মালিকের দেখা যাচ্ছে কোন একটা অনলাইন মার্কেটপ্লেসে অ্যাকাউন্ট আছে। সেখানে সে একটা কাজ নিয়ে এসে ষ্টুডেন্টদের দিয়ে করিয়ে নেয়, প্র্যাক্টিস এর নামে। হয়তো মাঝে মাঝে দুই চার পয়সা দেয় ষ্টুডেন্টদের। প্রজেক্ট এর আসল মূল্যের চেয়ে অনেক কমে। এটাই এদের আসল উদ্দেশ্য, ট্রেনিং সেণ্টার পরে, আদতে কম টাকায় কাজ করিয়ে নিজেদের পকেট ভড়ানো।

আসি ওয়েব ডেভেলপমেন্টে। প্রোগ্রামিং একটা বোঝার জিনিস। এর পেছনে অনেক কমপ্লিকেটেড টপিক আছে, অনেক জানার বোঝার ব্যাপার আছে। একটা কম্পিউটার সিষ্টেম কিভাবে কাজ করে, একটা অপারেটিং সিষ্টেম কিভাবে কাজ করে, ইন্টারপ্রেটর, কমপ্লাইলেশন এই জিনিসগুলো না জানলে প্রোগ্রামিং কখনোই সম্পুর্ন ভাবে বোঝা ও শেখা সম্ভব না। এরা ট্রেনিং সেন্টারের নামে যে জোক বানিয়ে রেখেছে, সেখানে এসব কিছুই শেখানো হয়না। ৯৯% ভাগ ট্রেনিং সেন্টারে HTML-CSS আর সামান্য PHP শিখিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। দুই এক জায়গায় হতো জাভাস্ক্রিপ্ট ও শেখানো হয়। ভেতরের কোর কনসেপ্ট গুলো, কিভাবে ল্যাঙ্গুয়েজ কাজ করে, সেসব কিছুই শেখানো হয়না। নির্ভেজাল প্রতারণা করা হয় ষ্টুডেন্টদের সাথে।

এর মাঝে কিছু ট্রেনিং সেন্টার আবার এক কাঠি সরেস। ওয়ার্ডপ্রেস ট্রেনিং এর নামে ষ্টুডেন্টদের হাতে নাল / পাইরেসি করা থিম / প্লাগিন নিয়ে গিয়ে মার্কেটপ্লেসে কম টাকায় এইসব জিনিস অফার করে এই ষ্টুডেন্টরা। Astra Pro’র মতো একটা থিমের দাম যেখানে ৪৭ ডলার, সেখানে এই ষ্টুডেন্টরা থিম ইন্সটলেশন সহ পুরো সাইট রেডি করে দেওয়ার অফার করে ১০ ডলার, Fiverr এ। ফলে ক্লায়েন্টরা প্রতারিত হচ্ছে, এদের জন্য দেশের রেপুটেশন খারাপ হচ্ছে। ধিরে ধিরে ক্লায়েন্টরা বাংলাদেশের ফ্রীল্যান্সারদের আর কাজ দিতে চাইছে না। Upwork এর মতো নেটওয়ার্কে এখন বাংলাদেশীদের প্রোফাইল অ্যাপ্রুভ হতে সময় লাগে বেশি, অনেকসময় হয় না। পেয়োনিয়ার কার্ড দেওয়া মাঝে বন্ধ করে দিয়েছিলো, পরে কমিউনিটির অনুরোধে আবার শুরু করেছে।

আর ইদানিং নতুন ধান্দা শুরু হয়েছে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট নিয়ে। জাভা পারুক না পারুক, অ্যাপ বানানো শেখানো হচ্ছে Webview দিয়ে। একটা ওয়েবসাইট কে অ্যাপে পরিণত করে প্লেষ্টোরে রিলিজ করা হচ্ছে, সেখানে Admob টাইপের অ্যাড সার্ভিস লাগিয়ে দুই পয়সা ইনকামের আশায়। বিভিন্ন অ্যান্ড্রয়েড গ্রুপে সারাদিন পোষ্ট আসে, সহজ সহজ কনসেপ্ট নিয়ে কারো আইডিয়া নেই, গ্রুপে এসে সাহায্য চাইছে খুব সিম্পল সিম্পল জিনিস কিভাবে করতে হবে জানার জন্য।

এভাবে চলতে থাকলে একদিন বাংলাদেশের আমরা যারা এক দশক ধরে কাজ করছি, বাইরের কোম্পানীতে চাকরি করছি, তারাও একদিন ভাত পাবো না। ফ্রীল্যান্সিং ট্রেনিং এর নামে এই প্রতারণা বন্ধ না হলে এই দেশের অনলাইন সেক্টরের ভবিষৎ খুব অন্ধকার।

লেখকঃ MD Mirajul Islam

Author: admin